অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
সাভারের উত্তর কাউন্দিয়া মৌজায় বাংলাদেশ সরকারের (ডিসি) নামে রেকর্ডভূক্ত প্রায় ১ একর (১০০ শতক) জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তির নামে হস্তান্তরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভূমিদস্যু চক্র, অসাধু কর্মকর্তা এবং জাল নথিপত্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতির চিত্র। এমনকি এই অনিয়মের অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিককে হেনস্তা ও হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে।
নদী থেকে ‘ডোবা’ শ্রেণী পরিবর্তনে জালিয়াতির শুভ সূচনা
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালে বিডিএস জরিপের সময় সাভার সেটেলমেন্ট অফিসের সার্ভেয়ার হাফিজুর রহমান সি.এস ও আর.এস রেকর্ডে নদী হিসেবে থাকা জমিকে কৌশলে ‘ডোবা’ হিসেবে শ্রেণি পরিবর্তন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে এই পরিবর্তন করা হয়, যাতে জমিটি ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়ার পথ সুগম হয়।
আপত্তি মামলা ও জাল রেকর্ড
২০২১ সালের ১১ মার্চ সালেহা বেগম, ফাতেমা বেগম ও শাহাবুদ্দিন খোদ সরকারের বিরুদ্ধে ৩০ ধারায় আপত্তি মামলা করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সেটেলমেন্ট অফিসের উপ–সহকারী এ কে এম মাহবুবুল আলম যাচাই–বাছাই ছাড়াই ওই ১ একর সরকারি জমি তাদের নামে রেকর্ড করে দেন।
এদিকে আমিনবাজার ভূমি অফিসের তৎকালীন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম একটি ‘ভুয়া’ প্রতিবেদনে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ নেই এবং বাদীগণ নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন।
রেকর্ড বইয়ের পাতা ছিঁড়ে প্রমাণ লোপাটের অপচেষ্টা
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জালিয়াতি পাকাপোক্ত করতে আর.এস ৯৮৮ নম্বর খতিয়ানের ৬২৭৪/৬৩২৬ দাগের সরকারি রেকর্ড বইয়ের দুটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন নায়েব নজরুল ইসলাম এতে জড়িত।
বর্তমান নায়েব মো. মনিরুজ্জামান স্বীকার করেন, রেকর্ড বইয়ের দুটি পাতা ছেঁড়া রয়েছে। তবে তিনি এ বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
জাল সার্টিফিকেটে জমির পরিমাণ পরিবর্তনের অপকৌশল
২০২৪ সালে জমির পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে দাবি করে সংশোধনের আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালে ঢাকা রেকর্ডরুমের একটি জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে জমির পরিমাণ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। পরে ৩১৫/২০২৪ নম্বর মিস কেস দায়ের করা হয়।
টাকা খেয়ে ‘মনগড়া’ তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করেন সার্ভেয়ার হান্নান
তদন্ত কর্মকর্তা সার্ভেয়ার হান্নান মিয়া প্রতিবেদনে দাবি করেন, আবেদনকারীরা জমিটি ভোগদখলে আছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এটি তুরাগ নদীর অংশ ছিল, যেখানে বর্ষায় পানি থাকত এবং তারা মাছ ধরতেন। সম্প্রতি জায়গাটি বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে।
মিস কেসে সরকারি জমি চূড়ান্ত হস্তান্তরে অনুমোদন দেন সাবেক এসিল্যান্ড বাসিত সাত্তার
২০২৫ সালের ২০শে মার্চ তৎকালীন এসিল্যান্ড মো. বাসিত সাত্তার ৩১৫/২০২৪ নম্বর মিস কেসের মাধ্যমে ১ একর সরকারি জমি ব্যক্তির নামে হস্তান্তরের অনুমোদন দেন। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া মিস কেস সহকারী জায়েদ আল রাব্বি ও কানুনগো হান্নান মিয়াকে এই জালিয়াতির মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সাংবাদিককে হেনস্তা ও “চোরে চোরে মাসতুতো ভাই
বর্তমান এসিল্যান্ড শাহাদাত হোসেন খানের কাছে এ বিষয়ে তথ্য জানতে গেলে তিনি সহযোগিতা না করে উল্টো সাংবাদিককে হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ। তিনি বলেন, “আপনি আমার কর্মকর্তাদের ডিস্টার্ব করবেন না… অফিসের অনুমতি নিয়ে আসবেন।”
রেকর্ড বইয়ের পাতা ছেঁড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অবলীলায় তা এড়িয়ে যান।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক এসিল্যান্ড মো. বাসিত সাত্তার বলেন, “আমি তো অনেকদিন আগে চলে এসেছি। কোন মিস কেসের কথা বলছেন, নম্বর দিলে বলতে পারব।” মানে ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না ??
অন্যদিকে, ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) রেজাউল করিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
সাভারের এই ঘটনা শুধু একটি জমি আত্মসাতের অভিযোগ নয়; এটি ভূমি প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাবের একটি বড় উদাহরণ। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় দেশপ্রেমী সচেতন মহল ।