বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
দিনাজপুরে থানায় জিডি করতে গিয়ে সাংবাদিকের কলার ধরে লকআপে নেওয়ার চেষ্টা তেজগাঁও কলেজ সাংবাদিক সমিতির নেতৃত্বে যুবরাজ-বুশরা চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় আড়াই কোটি টাকার ১০ টি স্বর্ণের বারসহ চোরাকারবারি আটক সর্বকাজের কাজী চুয়াডাঙ্গার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন ভারপ্রাপ্তের ভারে ভারাক্রান্ত, দেখার কেউ নেই ভাঙ্গুড়ায় দৈনিক আলোকিত নিউজের ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন ভালুকায় অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির দায়ে ২ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা চুয়াডাঙ্গায় ভোজ্যতেলের বাজারে সিন্ডিকেটের অস্থিরতা, প্রতিবাদে মানববন্ধন সাভারে সরকারি ১০০ শতক জমি আত্মসাৎ,রেকর্ড জালিয়াতি, ‘পাতা ছেঁড়া’ রহস্য ও কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ভারতে পাচারের চেষ্টাকালে ৮ বাংলাদেশি উদ্ধার, আটক- ২

তাসাউরের ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্যের ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে বান্দরবান এলজিইডি

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:

বর্তমান ফেনী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সময়ে তিনি ফেনীতে যোগদান করেন। এর আগে এলজিইডির এক অফিস আদেশে বান্দারবানে প্রতিপদ দেওয়ান কে পদায়ন করা হয়। ১৮ ই ডিসেম্বর মোহাম্মদ তাসাউরের বিদায় ও প্রতিপদ দেওয়ান এর বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বান্দরবান এলজিইডির কর্মকর্তা কর্মচারী ও ঠিকাদাররা। তবে এ বিদায় অনুষ্ঠান মোহাম্মদ তাসাউর এর জীবনে এক আলোকিত পথের সূচনা করলেও বান্দারবানবাসীদের জীবনে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়। আর তাই মোহাম্মদ তাসাউর সৃষ্ট দগদগে ক্ষতের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বান্দরবান এলজিইডি আজও হাঁটছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। কখনো হাঁটছে হামাগুড়ি দিয়ে।

নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর এর জামানায়
বান্দরবান এলজিইডিতে সবসময় চলেছে নীরব ঘুষ দুর্নীতি আর কমিশন বাণিজ্যের মহোৎসব। তবে লুটপাট বাণিজ্য সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করে জুন ২০২৫ সালে। সে সময় জুন মাসকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারী বিল প্রদানের নামে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউরসহ অন্যান্য প্রকৌশলীরা সরকারের অর্থ বরাদ্দে প্রকাশ্যে পাল্লা দিয়ে ঘুষ আদায় শুরু করে। সকলেই জানেন, জুন মাস সরকারী হিসাবের শেষ সময় হিসেবে ধরা হয় এবং এই সময়েই সরকারি উন্নয়ন কাজের ফাইনাল বিল প্রদান করা হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর ও তার সহকর্মীরা ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ হারে ঘুষ বা কমিশন আদায় করেন। যা প্রতি কোটিতে দাঁড়ায় ১৫ লাখ টাকা।
জুন মাসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাস্তা ব্রীজ কালভার্ট খালখননসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ শেষ না হতেই নির্বাহী প্রকৌশলী তাসাউরকে ম্যানেজ করে ঠিকাদাররা পুরো বিল তুলে নেন। এতে করে সেই সময়ই কাজের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা তৈরি।৷ যা বর্তমানে “”বোঝার উপর শাকের আঁটি”” র ন্যায় চেপে বসেছে। জসিম উদ্দিন নামক এক ঠিকাদার সেইসময় গণমাধ্যমকেন অভিযোগ করে বলেছিলেন, উন্নয়ন কাজের চেক প্রদান করতে নির্বাহী প্রকৌশলী ১৫ শতাংশ বাধ্যতামূলক ঘুষ বা কমিশনের নামে টাকা কেটে নিচ্ছেন। বিষয়টি সে সময় গোপনে প্রধান প্রকৌশলী আঃ রশীদ কে জানানো হলেও রহস্যজনক কারণে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং পিছিয়ে পড়া দুর্বল জেলা বান্দরবান থেকে তাসাউরকে তুলে এনে অপেক্ষাকৃত পরিপাটি জেলা ফেনীতে পদায়ন করেন।

ওইসময় বান্দরবান এলজিইডির টেন্ডার নিয়েও চলেছে নানা অনিয়ম। বিএনপির দুই গ্রুপ ও জামায়াতের একটি অংশ মিলে সমঝোতার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি। ২৪শে জুন ও ২৬শে জুন দুটি টেন্ডারেও ব্যাপক লুটপাট করা হয়। সেই সময় ওই দুটি ঠিকাদারি কাজ ভাগভাটোয়ারা করতেও একাধিক বৈঠক করে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ঠিকাদাররা। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে গোপন দরপত্র জানিয়ে দেন। এর বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে নিজের আখের গুছিয়ে নেন।

তাসাউরের সময়ে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব আয় ফাঁকি দিতে কিছু ঠিকাদার উপজাতীয় লাইসেন্স ব্যবহার করতো। এর ফলে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পার্বত্য রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এলজিইডির তালিকা ভুক্ত উপজাতী এবং বাঙালি মিলে প্রায় ২৫০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স রয়েছে।
পার্বত্য এলাকায় বাঙালীদের জন্য ৫% আয়কর (ইনকাম ট্যাক্স) প্রযোজ্য থাকলেও উপজাতীদের জন্য তা মওকুফ করা হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বান্দরবানের কিছু অসাধু বাঙালি ঠিকাদার সরকারী ৫% রাজস্ব ফাঁকি দিতে উপজাতী লাইসেন্স ব্যবহার করে কম দর দিয়ে কাজ নিয়ে গেছে। এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মি. মায়াধন কন্সট্রাকশন, এমএম ট্রেডার্স, মেসার্স মিল্টন ত্রিপুরা, মি. ইউটিমং, মেসার্স মার্মা এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদি।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু বাঙালি ঠিকাদার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগসাজশ করে ৫% আয়কর ফাঁকি দিয়ে উপজাতীয় নামের লাইসেন্সে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেছে এবং কাজ হাতিয়ে নিয়েছে। এভাবে কাজ পেতে তারা নির্বাহী প্রকৌশলী তাসাউর কে মোটা অংকের ঘুষ দেয়। এর ফলে বহু অভিজ্ঞ ঠিকাদার এই সিন্ডিকেটের কারণে কাজ পেতে ব্যর্থ হন।

অন্যদিকে, স্থানীয় ঠিকাদাররা দাবি করেন যে, তারা বারবার অভিযোগ দিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন, “প্রকল্পগুলোর কাজ ঠিকমতো হয়নি, অথচ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী এসব কাজের জন্য প্রকৃত ঠিকাদারদের উপেক্ষা করে “গোপন সমঝোতা” র মাধ্যমে অল্প কাজ করা ঠিকাদারদের কাছে পেতে হস্তক্ষেপ করেছেন।
অপর দিকে, বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) খাল খনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে শুরু থেকেই। শতভাগ বিল তুলে নিয়ে কাজের মেয়াদ শেষ হলেও আজও কাজ সম্পন্ন হয়নি। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে আলীকদম উপজেলা সদরের পানি সংকট নিরসনে ক্যায়াং ঝিড়ি খাল খনন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটির মাধ্যমে হিন্দু পাড়া, নাজির চেয়ারম্যান পাড়া, বাজার পাড়া, থানা পাড়া, আলীম উদ্দিন পাড়া, পোস্ট অফিসসহ কয়েকটি পাড়ার অন্তত ১০ হাজার মানুষ উপকৃত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজটি সম্পন্ন না হওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

ওই প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭২ লাখ টাকা কিন্তু কাজটি এখনও শেষ হয়নি। ইউনি ব্লক স্থাপন, ওয়াকওয়ে ও বিনোদন কেন্দ্র তৈরি করার কথা থাকলেও খালটি খনন করার বাইরে কিছুই করা হয়নি। প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে এবং খালটির দুই পাড় ভেঙ্গে পড়ে আবার খালের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে সরকারী টাকা অপচয় ছাড়া তেমন কিছু দৃশ্যমান নয়।

বান্দরবান এলজিইডিতে মোহাম্মদ তাসাউর এর বিশ্বস্ত দুই সহচর সহকারী প্রকৌশলী জয় সেন ও উপজেলা প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, এই প্রকল্পের তদারকি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রকল্পটির দায়িত্বে ছিলেন ঠিকাদার মো. কায়সার।

বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর সৃষ্ট এইসব অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে বান্দরবান এলজিইডিতে উন্নয়ন কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হয়ে পড়ে আছে। আর যেসব ঠিকাদাররা ১৫% হিসেবে তাসাউরকে ঘুষ বা কমিশন দিয়েছিলেন সেসব ঠিকাদাররা এখনো সরকারের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য নানা ধরনের চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছেন। যার ফলে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান এর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এটি সরকারের জন্যও এক বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি মোহাম্মদ তাসাউর সংশ্লিষ্ট সকল কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফেনী থেকে আবার বান্দরবান এলজিইডিতে স্থানান্তরিত করা হোক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page