রংপুরের মানুষের সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দিতে কার্পণ্য নেই। গত ১৫ মাসে রংপুর জেলা ট্রাফিক বিভাগ মহানগর বাদ দিয়ে জেলার ৮ উপজেলা থেকে ৭৫৭৬টি মামলা করে আয় করেছে ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। জরিমানার পরিমাণ ১ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অথচ সেই আয়ের বিপরীতে সেবা মিলছে না রাস্তায়। পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, কাউনিয়া, তারাগঞ্জসহ ৮ উপজেলার সড়কগুলো এখন চলাচলের অনুপযোগী। ট্রাফিক পুলিশের দেখা মেলায় ভার।
জেলা ট্রাফিক বিভাগের তথ্য বলছে, রংপুর জেলার ৮ উপজেলা জুড়ে টিএসআই, সার্জেন্ট, এটিএসআই, কনস্টেবলসহ মোট জনবল রয়েছে ৭৬ জন। বিশাল এই বাহিনীর কাজ কী? স্থানীয়দের অভিযোগ একটাই – “মামলা দেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই।
রাস্তায় সেবা নেই, আছে শুধু জরিমানা,সরেজমিনে দেখা গেছে, পীরগঞ্জ-রংপুর, মিঠাপুকুর-রংপুর, কাউনিয়া-রংপুর ও তারাগঞ্জ মহাসড়কে ট্রাফিক সার্জেন্টের অনুপস্থিতি চরম। অবৈধ অটো, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, রাস্তার ওপর বাজার, অদক্ষ ড্রাইভার – সবই চলছে যথেচ্ছভাবে। দুর্ঘটনা ঘটলেও ঘটনাস্থলে ট্রাফিক পুলিশ পাওয়া যায় না।
ভুক্তভোগী মিঠাপুকুরের সিএনজি চালক শফিকুল ইসলাম বলেন, “সারা মাসে একবারও ট্রাফিক দেখি না। শুধু মাসের শেষে হঠাৎ এসে মামলা দিয়ে চলে যায়। রাস্তায় জ্যাম, অবৈধ পার্কিং দেখার কেউ নেই।
কাউনিয়ার বাসিন্দা মোসলেম হক বলেন, আমাদের রাস্তায় হাইওয়ে পুলিশ ছাড়া আর কেউ নেই। ট্রাফিকের ৭৬ জন লোক বেতন নেয়, কিন্তু জনগণের জন্য কাজ করে না। তারা এখন শুধু টাকা তোলার মেশিন হয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ মাসে শুধু মামলা থেকেই জেলা ট্রাফিক বিভাগের আয় ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এই আয়ের পুরোটাই মহানগর এলাকা বাদ দিয়ে। অর্থাৎ ৮ উপজেলার সাধারণ মানুষের পকেট কেটেই এই আয়। ৭৫৭৬টি মামলার মধ্যে সর্বনিম্ন জরিমানা ১ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
অথচ এই ৮ উপজেলায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই। ট্রাফিক সিগন্যাল নষ্ট, জেব্রা ক্রসিং নেই, ফুটপাত দখল, স্কুল-কলেজের সামনে স্পিড ব্রেকার নেই। স্কুল ছুটির সময় শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা ট্রাফিকের কয়েকজন সদস্য বলেন, “উপর থেকে চাপ আছে – মাসে এতগুলো মামলা করতে হবে। রাস্তায় ডিউটি করে লাভ কী? মামলা না করলে বকা খেতে হয়।”
এদিকে রংপুর জেলার প্রধান সড়কগুলো দেখভাল করে হাইওয়ে পুলিশ। জেলা ট্রাফিকের কাজ উপজেলা সড়ক ও বাজার এলাকা। কিন্তু সেখানেও তাদের দেখা যায় না।
তারাগঞ্জের ব্যবসায়ী আব্দুল মোল্লা বলেন, “বাজারে রিকশা-ভ্যানে পুরো রাস্তা বন্ধ। ট্রাফিককে ফোন দিলেও আসে না। বলে এটা হাইওয়ের কাজ। তাহলে ৭৬ জন লোক কী করে?”
ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতির কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে জ্যামে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা নিরাপদে পারাপার হতে পারছে না। অথচ সরকারি বেতন-ভাতা ঠিকই পাচ্ছেন ৭৬ জন জনবল।
এ বিষয়ে জেলা ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম যোগদানের ১৫ মাসে মামলা বাবদ প্রায় আড়াই কোটি টাকা আয়ের হিসাব দেখাতে পারলেও, তার অধীনস্থ ৭৬ জন সদস্য কোথায়, কখন ডিউটি করছেন – সেই তথ্য নিশ্চিত করতে পারেননি।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মামলা দিয়ে আয় করাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে জনগণকে সেবা দেওয়ার নামে এই প্রহসন বন্ধ করা হোক। ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ৮ উপজেলার মানুষ পাচ্ছে শুধু ভোগান্তি।
জনগণের প্রশ্ন – আয়ের টাকা দিয়ে রাস্তা ঠিক হবে কবে? ট্রাফিক পুলিশ মামলার মেশিন থেকে সেবকের ভূমিকায় ফিরবে কবে?