#আহত ও অসুস্থ শ্রমিকদের দাবি, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ১০-১৫ কার্য দিবসের মধ্যেই নিশ্চিত করতে হবে
দেশের শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন চিকিৎসা, দুর্ঘটনা, স্থায়ী অক্ষমতা ও মৃত্যুজনিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। তবে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার এই অর্থ পেতে শ্রমিকদের অনেক ক্ষেত্রে ৬ মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসার অর্থের অভাবে বহু শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, সম্পদ বিক্রি করছেন, এমনকি চিকিৎসা বন্ধ করতেও বাধ্য হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবেদনকারী শ্রমিকের মৃত্যুর পর পরিবারের হাতে পৌঁছেছে সরকারি অনুদানের চেক।
ফাউন্ডেশনের নীতিমালা অনুযায়ী কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকের জরুরি চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও স্থায়ী শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারকে দুই লাখ টাকার সঙ্গে দাফন বা সৎকার বাবদ অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা প্রদান করছেন সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনুদান পেতে শ্রমিকদের দুর্ঘটনার বিবরণ, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র, হাসপাতালের বিল, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্যসহ নির্ধারিত আবেদনপত্র জমা দিতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ বা ট্রেড ইউনিয়নের সুপারিশও প্রয়োজন হয় ওই আবেদনে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, আবেদন জমা দেওয়ার পর পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় প্রকৃত উপকারভোগীরা সময়মতো সহায়তা পান না। চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত জরুরি অনুদান পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেক শ্রমিক মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
একজন ভুক্তভোগী শ্রমিক বলেন, “দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু টাকা পাওয়ার আগেই ধারদেনা করে চিকিৎসা চালাতে হয়েছে। সরকারি সহায়তা সময়মতো পেলে এত কষ্ট করতে হতো না।”
গত বৃহস্পতিবার রংপুর মহানগরীর আরকে রোডে অবস্থিত শ্রম অধিদপ্তরের কার্যালয়ে উপ-পরিচালক তুষার কান্তি রায় জানান, সারা দেশ থেকে আবেদনপত্রের হার্ডকপি ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে সভার মাধ্যমে আবেদন যাচাই-বাছাই ও বিল অনুমোদন করা হয়। অনুমোদনের পর শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন চেক বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করে।
তিনি জানান, সম্প্রতি প্রায় ৮০০ শ্রমিকের মধ্যে অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়েছে। তবে আবেদন জমা দেওয়ার পর কতদিনের মধ্যে চেক বিতরণ করা হয়, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা তিনি উল্লেখ করতে পারেননি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আবেদনকারী শ্রমিক মারা গেলে পুরো প্রক্রিয়া আবার নতুন করে শুরু হয়। সে ক্ষেত্রে চেক ঢাকায় ফেরত পাঠিয়ে ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদসহ নতুন কাগজপত্র সংগ্রহ এবং পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে হয়। এতে অনুদান পেতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যায়।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, চিকিৎসা সহায়তার অর্থ যখন জরুরি প্রয়োজনে দেওয়ার কথা, তখন সেটি পেতে যদি ছয় মাস বা এক বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সহায়তার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। তাদের মতে, আবেদন গ্রহণ থেকে অর্থ বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল পদ্ধতিতে এনে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করা উচিত।
তাদের দাবি, আবেদন জমা দেওয়ার সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অনুদানের অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন প্রতিবেদককে বলেন, “সরকার শ্রমিকদের কল্যাণে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে এসব সহায়তা দ্রুততম সময়ে প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোনো শ্রমিক প্রশাসনিক জটিলতার কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।”
বিশ্লেষকদের মতে, চিকিৎসা সহায়তার অর্থ বছরের পর বছর ফাইলবন্দি থাকলে তার কোনো বাস্তব মূল্য থাকে না। জরুরি চিকিৎসার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত না হলে প্রতিবছর বহু শ্রমিক চিকিৎসার অভাবে জীবন হারানোর ঝুঁকিতে থাকবেন। তাই শ্রমিক কল্যাণের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা, জবাবদিহি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালুর বিকল্প নেই।