উত্তরা ভূমি অফিসে মাকসুদুর আলমের ‘একক রাজত্ব’: ফাইল আটকে ঘুষ বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য!
বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের ফোন, কিন্তু রিসিভ করার সময় নেই ‘মহাব্যস্ত’ মাকসুদুরের
…………………………………………………
শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও ঢাকা জেলা প্রশাসনের অধীনস্থ উত্তরা ভূমি অফিসে এখনো বহাল তবিয়তে চলছে এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ডিজিটাল কায়দার জুলুম ও ঘুষ বাণিজ্য। খিলক্ষেতের দাপট দেখিয়ে এবং একচ্ছত্র সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাধারণ জমির মালিকদের জিম্মি করে রেখেছেন উত্তরা ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মাকসুদুর আলম। দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে একই স্থানে জেঁকে বসে রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তা ও দালালের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য দুর্নীতির দুর্গ।
……………….
চাকরিকাল ও তথ্যের বিবরণ:
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাকসুদুর আলমের জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯৮৭ সালে। তিনি গত ৩০ মে ২০১২ তারিখে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বর্তমান কর্মস্থল উত্তরা ভূমি অফিসে যোগদান করেন (তার পূর্বতন কর্মস্থল ছিল মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের বাউনিয়া ভূমি অফিস)। বর্তমান কর্মস্থলে বিগত ৪ বছর ১০ মাসেরও বেশি সময় ধরে একই আসনে খুঁটির জোরে বসে আছেন তিনি। তার পি.আর.এল (PRL) এ যাওয়ার তারিখ ০১/০১/২০৪৭ সাল।
……………………..
খিলক্ষেতের পরিচয় ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দাপট:
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও অনুসন্ধানে জানা যায়, ডুমনি ও খিলক্ষেত এলাকায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাকসুদুর আলমের প্রভাব ছিল আকাশচুম্বী। তবে খোলস বদলাতে তার সময় লাগেনি। স্থানীয় খিলক্ষেত থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো. কেরামত আলী দেওয়ানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও দখলদারিত্বের অন্যতম অংশীদার হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন এই মাকসুদুর আলম।
আওয়ামী সরকারের পতনের পর যখন সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরার কথা, তখন মাকসুদুর আলম তার খিলক্ষেতের আঞ্চলিকতার হুংকার দিয়ে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি হয়রানি করছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তিনি ধমক দিয়ে বলেন, “আমি খিলক্ষেতের সন্তান, আমার জেলা ঢাকা; আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না।”
ফাইল বন্দি ও ডিজিটাল ঘুষ বাণিজ্য:
উত্তরা ভূমি অফিসে এখন সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের প্রবেশ করা দায়, কিন্তু অবাধ বিচরণ রয়েছে দালালের। ডানে-বামে একাধিক দালাল চক্র দিয়ে পুরো অফিস নিয়ন্ত্রণ করছেন মাকসুদুর আলম। রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি সাধারণ মানুষের বৈধ ফাইলের ত্রুটি খুঁজে বের করেন এবং ফাইল আটকে রেখে মনগড়া মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল বন্দি করে রাখা হয়। বর্তমানে সরাসরি টাকা লেনদেনের চেয়ে দালাল ও ডিজিটাল মাধ্যমে তিনি এই অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তের নামে কফি বিলাস ও ভুক্তভোগী গ্রাহকের অভিজ্ঞতা:
সেবাগ্রহীতা আব্দুল কুদ্দুস নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তার একটি ফাইলের বিষয়ে খোঁজ নিতে মাকসুদুর আলমকে ফোন দেওয়া হলে তিনি জানান যে তিনি একটি তদন্তের কাজে বাইরে আছেন। অথচ ভুক্তভোগী উত্তরা অফিসে ফেরার পথে দেখতে পান যে মাকসুদুর আলম একটি দোকানে বসে আয়েশ করে কফি খাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের অজুহাতে অফিসে না আসা, বিনা কারণে কাগজে ভুল ধরিয়ে দিয়ে ঘুষের জন্য তালবাহানা করা এবং সাধারণ মানুষের ফোন না ধরা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। নিজের বাড়ি খিলক্ষেত হওয়ায় এই দাপটে তিনি কাউকেই তোয়াক্কা করেন না।
বক্তব্য জানতে ফোন, কিন্তু রিসিভ করার সময় নেই মাকসুদুর আলমের:
উত্তরা ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মাকসুদুর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা ফাইল আটকে রাখা, দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল ঘুষ বাণিজ্যের এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এবং তার আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য নিতে এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি এতটাই ‘ব্যস্ত’ যে, একাধিকবার কল করা সত্ত্বেও ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য:
উত্তরা ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মাকসুদুর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা ফাইল আটকে রাখা, দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন—
”ভূমি অফিসকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত ও সেবাগ্রহীতা-বান্ধব করতে আমরা নিরলস কাজ করছি। কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফাইল আটকে রাখা কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মাকসুদুর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমরা খতিয়ে দেখব এবং সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অনুরূপভাবে, ঢাকা জেলা প্রশাসনের এক উর্ধ্বতন রাজস্ব কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—
”সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকা এবং আঞ্চলিকতার প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার কোনো সুযোগ নেই। মাকসুদুর আলমের বিরুদ্ধে লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ এলে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তদন্তের দাবি ও অনুসন্ধান চলমান:
কোন অদৃশ্য ইশারায় এবং কার খুঁটির জোরে এত অপরাধ ও লিখিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন মাকসুদুর আলম একই গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কে বহাল আছেন, তা নিয়ে খোদ ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তার এই অপকর্মের বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় তদন্ত না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ জমির মালিক ও ভুক্তভোগীদের মাঝে।
ফাইল আটকে ঘুষ বাণিজ্য, একাধিক দালাল সিন্ডিকেটে নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার এই মহোৎসবের পেছনে আর কারা জড়িত? মাকসুদুর আলমের মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচন করতে ধারাবাহিক অনুসন্ধান চলমান থাকবে