বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ঢাকা মেট্রো-৪ কার্যালয়ে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা, মোটরযান রেজিস্ট্রেশন এবং ফিটনেস সনদ প্রদানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মোটরযান পরিদর্শক অনিমেষ মণ্ডল। একাধিক সেবাগ্রহীতা ও ভুক্তভোগীর দাবি, সরকারি সেবা পেতে নির্ধারিত ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে নানা ধরনের হয়রানি, বিলম্ব এবং অযৌক্তিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এদিকে ভূক্তভোগীদের অভিযোগ এসব বিষয়ে সহকারী পরিচালক ( ইঞ্জিন:) রফিকুল ইসলামের নিকট একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও তিনি তা আমলে নেন না। অনুসন্ধানে জানা গেছে সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম এর আগে বিআরটিএ’র ঢাকা মেট্রো-১ এ চাকরি করাকালীন সময়ে ব্যাপক ঘুষ দুর্নীতির কারণে তাঁকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। পরে সেই বদলি আদেশ ঠেকাতে গোপন সিঁড়ি ব্যবহার করে সংবাদ শিরোনাম হন। পরবর্তীতে অনেক জল ঘোলা শেষে ঢাকা মেট্রো সার্কেল- ১ এ এসে মিলিত হন সাবেক ছাত্রলীগের দুই পেতাত্মা সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম ও মোটরযান পরিদর্শক অনিমেষ মন্ডল।

অভিযোগ অনুযায়ী, অনিমেষ মণ্ডল এর আগে বিআরটিএ যশোর কার্যালয়ে কর্মরত থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের নানা অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি ঢাকা মেট্রো-৪ কার্যালয়ে যোগদানের পর একই ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাপ্রার্থী। এর আগে অনিমেষ মন্ডল নামের এই সাবেক ছাত্রলীগের পেতাত্মা ৫ ই আগস্ট ২০২৪ জুলাই আন্দোলনের পর ব্যাপক কোনঠাসা হয়ে পরেন। ফলে মাসখানেক কিছুটা আত্মগোপনে থাকার পর আস্তে আস্তে তিনি আবারো স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, নিয়ম মেনে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার পরও অনেক পরীক্ষার্থীর ফলাফলে অনলাইনে “ফেল” দেখানো হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কখনো “সার্ভারের সমস্যা”, কখনো “প্র্যাকটিক্যাল ঠিকমতো হয়নি”, আবার কখনো “ম্যাজিস্ট্রেট খাতা দেখেছেন, এখন কিছু করার নেই,এমন নানা অজুহাত দেওয়া হয়। এরপর পুনরায় পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ইঙ্গিত দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আশ্চর্য বিষয় হল অনিমেষ মন্ডলের অফিসে কেউ দেখা করতে গেলে সব সময় মুখে একটা মাক্স পড়েই থাকেন। সে সব সময় মনে মনে ভাবে আমি কি যেন কি করেছি কোন অপরাধ।
এমনটাই উনি ভেবে থাকেন, সে একমাত্র তার কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সামনে ছাড়া তার মুখের মাক্স খুলে না।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ প্রদান করলে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা সীমিত রেখে বা শূন্য পেলেও পাস করিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি কেউ কেউ অভিযোগ করেন, শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিলেই হবে, বাকিটা আমরা করে দেব এ ধরনের আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায় করা হয়।
শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়, মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ প্রদানেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাপ্রার্থী। তাদের ভাষ্য, সরকারি নির্ধারিত ফি-এর বাইরে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, অযথা বিলম্ব করা কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে বারবার ঘোরানো হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল প্রশাসনিক দুর্নীতির বিষয় নয়; বরং দেশের সড়ক নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। কারণ অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য চালককে লাইসেন্স কিংবা ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়া হলে তা যে কোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম ও মোটরযান পরিদর্শক অনিমেষ মণ্ডলের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিআরটিএর সেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম এবং ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।