সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শেখ হাসিনার পেতাত্মা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে কট্টর ভূমিকা পালন ও অর্থলগ্নিকারী নগর গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা এখনো রয়েছেন বহাল তবিয়তে। ইতোমধ্যে তিনি ঘুষ দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের টাকায় হয়েছেন শতকোটি টাকার মালিক। নামে বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। অফিস স্টাফ ও ঠিকাদার সমাজে মাসুদ রানা “মিস্টার ফিফটিন পার্সেন্ট” হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। কারণ প্রতিটি কাজে তাঁকে ১৫ পার্সেন্ট টাকা অগ্রীম দেওয়াটা গণপূর্ত ডিভিশনে এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ হোসেন ডিলুর মাধ্যমে ২০১৯ সালে রাজশাহী থেকে ঢাকায় বদলী হয়ে আসেন। আর হয়ে ওঠেন প্রতিমন্ত্রীর প্রিয়জন। প্রতিমন্ত্রীকে সব রকমের সুযোগ সুবিধা দিয়ে গণপূর্তের “মুকুটহীন সম্রাট”হিসেবে নিজের জাত চেনাতে সক্ষম হয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা। “চোরে চোরে মাসতুতো ভাই”এই ফর্মূলায় প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মাসুদ রানার ডিভিশনে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ হতে থাকে। আর কাগজ কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখিয়ে লুটে নেন কোটি কোটি টাকা।
সুত্রমতে, সাবেক মন্ত্রী আওয়ামী দোসর শরীফ হোসেন ডিলুর ইচ্ছায় রাজশাহী থেকে তাকে বদলী করে ঢাকায় আনা হয়। এরপর পদায়ন করা হয় ঢাকা শেরে বাংলা নগর -৩ নং ডিভিশনে । সেখান থেকে লুটপাটে হাত পাকিয়ে সাবেক মন্ত্রী র, আ, ম উবায়দুর মুক্তাদুরের আমলে বিশেষ তদবির আর গোপনসিঁড়ি ব্যবহার করে ঢাকা -৪ ডিভিশনে পদায়ন বাগিয়ে নেন। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনকে মাসুদ রানা প্রায় ৪ বছর ১৫% কমিশন ও ঘুষ দুর্নীতি আর ভূয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন। ৩ ও ৪ ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থেকে অবৈধ পথে গড়েছেন কালো টাকার পাহাড়। নামে বেনামে হয়েছেন একাধিক প্লট, ফ্লাট, আলিসান বাড়ি, দামি গাড়ি ও খানদানি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক।
অবৈধ পথে অর্জিত কালোটাকার বদৌলতে হাতের মুঠিতে ধরে রেখেছেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও প্রধান প্রকৌশলীকে। জনশ্রুতি আছে যখন যে মন্ত্রী,প্রতিমন্ত্রী ও প্রধান প্রকৌশলী ক্ষমতায় থাকেন চতুর মাসুদ রানা দামি গাড়ি, ফ্লাট সহ বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে বশিভূত করে ফেলেন সকলকে।

এছাড়াও তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো: শামীম আখতারকে নিজের আত্মীয় বলে পরিচয় দেন। যে কারণে ঢাকার বাইরে তাকে কেউ বদলি করেনা ?? তাই সুকৌশলে ঘুরে ফিরে ঢাকা ডিভিশনের মধ্যেই আছেন প্রায় ৭ বছর। অথচ: ৫ই আগষ্ট ২০২৪ স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন হলে সরকারি সমস্ত দপ্তরে ব্যাপক রদবদল করে আওয়ামী সুবিধাবাদী কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ব্যাপক রদবদল ও ডামাডোলের মাঝেও গণপূর্ত ৪ নং ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা বহাল তবিয়তে থেকে হয়েছেন ” কালোটাকার শক্তিতে উদ্ভাসিত”।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো: আদিলুর রহমানকে ম্যানেজ করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ নগর গণপূর্তের ৪ নং ডিভিশনে রয়ে যান।
অভিযোগ আছে যে, তিনি রাজশাহী ডিভিশনের লোক হওয়ায় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার প্রিয়জন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: শাহাবুদ্দীন চুপ্পুর সাথেও বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁর বাসায় মাসুদ রানা ঘনঘন যাতায়াত করেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।
অন্তরবর্তীকালীন সরকার বিদায় নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানার কোন পরিবর্তন হয়নি। তিনি এখনো নগর গণপূর্তের ৪ নং ডিভিশনেই বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বর্তমান সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করছেন। বলছেন, দুইজন মন্ত্রী,প্রতিমন্ত্রীই নাকি তাঁর নিকট আত্মীয়। এতে করে তাঁদের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। বিএনপি সরকারেরও বদনাম হচ্ছে। জনশ্রুতি আছে যে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে তিনি ৩ কোটি টাকা উপঢৌকন দিয়ে স্বপদ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
আরো জানা গেছে, ঢাকার অভিজাত এলাকার ফাইভ স্টার হোটেলে উঠতি নায়িকা ও হাল মডেলদের সাথে একান্তে সময় কাটানোর অভিযোগও আছে তাঁর বিরুদ্ধে। জুলাই ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এই নির্বাহী প্রকৌশলী গণপূর্তের ঠিকাদার মহলে “মিস্টার ফিফটিন পার্সেন্ট” (১৫%) রানা হিসেবে ব্যাপক সমাদৃত!!!
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ থাকা অবস্থায় তিনি হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
বর্তমানে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ -৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে ঘুষ দুর্নীতি কমিশন বাণিজ্য ও লুটপাটের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।

মাসুদ রানার বিরুদ্ধে একটি স্পর্শকাতর অভিযোগ হলো-তিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মিরপুরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমানোর জন্য আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ক্যাডারদের আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন এবং আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি মাঈনুল হোসেন খান নিখিলের কথামত সব কাজ করতেন। এ নিয়ে শেরে বাংলা নগর থানার সামনে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলো সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যা প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী অবগত আছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মাসুদ রানার দুর্নীতির কৌশল ছিল বহুমূখী। টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন নেওয়া, কাজ সম্পন্ন না করেই ভূয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিল উত্তোলন এবং অস্তিত্বহীন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অনেকটা “কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই”।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্তের একাধিক ঠিকাদার বলেন, তাঁর নির্ধারিত ১৫% কমিশন ছাড়া কোনো বিল পাশ করা অসম্ভব!!!!
সূত্রমতে, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন প্রভাবশালী সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই মাসুদ রানার নিজস্ব ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়। এরপর তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। এমনকি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তার ‘ক্যাশিয়ার’ বা অর্থ সংগ্রাহক হিসেবেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

দুর্নীতির মাধ্যমে মাসুদ রানা গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার সম্পদ। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের যে তালিকা পাওয়া গেছে তা পিলে চমকানোর মতো।
গুলশানে ঘনিষ্ঠ এক ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রাপ্ত একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। রামপুরা বনশ্রীর ডি-ব্লকে (বাসা নং ৫৪/ডি) ৫ তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। এছাড়া এফ-ব্লকের মোল্লা ম্যানশনে স্ত্রীর নামে আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরা সিটিতে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলায় (বি ব্লক) দুটি মূল্যবান দোকান। মোহাম্মদপুরে বাবর রোডে (রোড-৯, বাসা-১৮৯/এ) নিজের নামে ১০ কাঠার একটি বিশাল প্লট, যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া মোহাম্মদপুর ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজের এবং শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজন শ্যালক শ্যালিকাদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
আওয়ামীলীগ সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে অধিদপ্তরে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিএনপি সরকারের এই সময়ে এসেও যদি এসব ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার উত্তরাধিকারী’রা বহাল তবিয়তে থাকেন, তবে বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও সচেতন মহলের দাবি, এই প্রকৌশলীর অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত করুক “দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম”। একই সাথে তাকে বিভাগীয় তদন্ত পূর্বক বিচারের মুখোমুখি করা হোক।।।